আমার দৃষ্টিতে মোট জনসংখ্যা – নাসরিন সুলতানা।

0

আমার দৃষ্টিতে মোট জনসংখ্যা

আমি নগর এলাকায় থাকি। আমার জাতীয় পরিচয় পত্রে প্রদানের তারিখ লেখা আছে ২৬/১২/২০০৭। আমার বাসায় তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি শহরের একটা বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করেন। আমি তাকে আমার বর্তমান ও ¯থায়ী ঠিকানা এক দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। জাতীয় পরিচয় পত্রে ভাড়া বাসার ঠিকানা থাকার ব্যাপারে আমার আপত্তি ছিল। তিনি বললেন যে সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়। আজকে যে যেখানে আছে সে সেখান থেকে ভোটার হবে। আমি তখন মেনে নিলাম। তখন আমি গ্রামে চাকরি করতাম। বিদ্যালয় এলাকায় ‘ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও জাতীয় পরিচয় পত্র প্রদান বিষয়ক প্রশিক্ষণ ২০০৭-২০০৮’-এ আমরা অংশ নিলাম ২০০৮-এর মে মাসে। তিন দিনের এ প্রশিক্ষণে আমাদেরকে ঐ কথাটা বলা হয়নি। আজ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষকরা যাদের তথ্য সংগ্রহ করছেন তারা কেউ বাসা পরিবর্তন করে জাতীয় পরিচয় পত্র করেন না। যাদের কোনো শিক্ষাগত সনদপত্র নেই তারা নাম পরিবর্তন করে নতুন করে জাতীয় পরিচয় পত্র করতে পারে। যাদের জাতীয় পরিচয় পত্রে লেখা মা-বাবার নামের সাথে মা-বাবার জাতীয় পরিচয় পত্রের নাম ভিন্ন হয় তারাও মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে দ্বিতীয়বার জাতীয় পরিচয় পত্র করতে পারে। এগুলো হচ্ছে জাতির সাথে প্রতারণা।

আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্ম নিবন্ধন করার জন্য আমাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো ২০০৯ সালে। ২০১০ সালে শিশু ভর্তি হতে এলে সে জন্ম নিবন্ধন সনদপত্র নিয়ে আসবে। জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয় পত্র পাওয়া মানেই এ দেশের নাগরিক হওয়া। এখান থেকেই আসবে মোট জনসংখ্যা। তা হলে আমি কী লিখতে বসলাম?

আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা প্রতি বছর সতেরো থেকে একত্রিশে ডিসেম্বর পর্যন্ত জরিপ করি। এটাকে শিশু জরিপ বলা হলেও আমরা মোট জনসংখ্যার হিসেবটাই করি। এ জন্য আমাদেরকে কোনো টাকা দেওয়া হয় না। ২০১০ সালে জরিপের জন্য প্রত্যেক শিক্ষককে ৫০০ করে টাকা দেওয়া হয়েছিল। সে বছর আমাদের তথ্যছক কিনতে হয়নি। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকেই দেওয়া হয়েছিল।

আমরা হিসেব দিলাম। ইউনিসেফ বলল যে মোট জনসংখ্যা এর চেয়ে বেশি। আমাদের কর্মকর্তরা আমাদেরকে আবার জরিপ করতে বললেন। তখন শিক্ষকরা বললেন যে চার-পাঁচ তলা ভবনের নিচে তালা দেওয়া থাকে। আমরা ঢুকতে পারি না। কোনো কোনো বাসায় তালা দেওয়া থাকে। আমরা জরিপ করতে পারি না। কোনো কোনো বাসায় ঢুকতে দেয় না। অসম্মান করে। আমরা তথ্য আনতে পারি না।

চৌদ্দ বছর কাটিয়ে দিলাম প্রাথমিক শিক্ষায়। আজ আমি দেশের মোট জনসংখ্যা নিয়ে লিখতে বসেছি। জানি না এ বিষয়ে কেউ লিখেছেন বা বলেছেন কি না। বললে আমি বলতাম না। সব পাপের মূল কী? মিথ্যে। এই তথ্যটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে আছে। আমি এর সাথে পুরোপুরি একমত। আপনার চারপাশে তাকিয়ে দেখুন। যত অন্যায় আছে সব কিছুর মূলে আছে মিথ্যে। একজন মানুষকে তার সন্তান খুন করেছে। সন্তানকে বাঁচানোর জন্য খুন হওয়া মানুষটির স্ত্রী মিথ্যে বলে। সাংবাদিক মিথ্যে লেখে। উকিল মিথ্যে যুক্তি দেয়।

ঘরে দুবছরের সন্তান আছে। জরিপের সময় তার তথ্য দেওয়া হয় না। তার জন্ম নিবন্ধন করা হয় না। বয়স কমিয়ে জন্ম নিবন্ধন করা হবে। অথচ তারা স্বা¯থ্যসেবা নিচ্ছে। নিচ্ছে না? কোনো শিশু আছে যাকে টিকা দেওয়া হয় না বা ভিটামিন এ খাওয়ানো হয় না? তা হলে ইউনিসেফ কেন জানবে না যে আমাদের তথ্য সঠিক নয়? তারা তো এ দেশের সব কাজের সাথে আছে। তারা জানে না এমন কিছু নেই।

আপনি হয় তো আমার লেখাটা পড়ছেন আর মুখ টিপে টিপে হাসছেন। ভাবছেন যে আপনি যে কথাটা গোপন রেখেছেন সেটা আমি বলিনি। আমি সেটাও বলব। আমি বলার জন্যই বসেছি। আপনি শিশুর বয়স কমিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছেন। সেগুলো আদৌ বিদ্যালয় কি না আপনি তা জানেন না। কিন্তু আমি জানি। আজ সে আলোচনায় যাব না। শুধু এ টুকু বলব যে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে হলে শিশুর বয়স ডিসেম্বর মাসে ছয় বছর পূর্ণ হতে হবে। এই কথাটা যে প্রতিষ্ঠান জানে না আপনি আপনার সন্তানকে সেখানে পড়িয়েছেন। বছরের পর বছর পড়িয়ে ওর মাথাটাকে ভারি বানিয়ে সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে এসেছেন। সরকারি বিদ্যালয় বলেছে শিশুর বয়স কম আছে। তখন আপনি আবার জন্ম নিবন্ধন করেছেন। বয়স পরিবর্তন করা যাচ্ছে না বলে নাম পরিবর্তন করেছেন। তাতে কী হলো? আপনার সন্তান আছে একটা কিন্তু নিবন্ধন হয়েছে দুটোর।

এখন কেউ যদি বলেন যে মোট জনসংখ্যা ঠিক আছে। অনেক বাচ্চার জন্ম নিবন্ধন হয়নি আবার অনেক বাচ্চার জন্ম নিবন্ধন কয়েকবার হয়েছে। এটা তো সঠিক পদ্ধতি নয়। শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করাতে হবে। কেন একটা মিথ্যে হিসেবের মধ্যে থাকব আমরা? আমার খুব খারাপ লাগে যখন একজন সরকারি কর্মচারী তার সন্তানের নাম না লিখে অফিসে তথ্য জমা দেন। শিশুর বয়স কমানোর জন্য এত বড় একটা মিথ্যের আশ্রয় নেওয়া! মানুষ একটা সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য কত ডাক্তারের কাছে যায়! সন্তানের বড় কোনো রোগ হলে তার চেয়েও বেশি ডাক্তারের কাছে যায়। ! সন্তানের বড় কোনো রোগ হলে তার চেয়েও বেশি ডাক্তারের কাছে যায়। সেই সন্তানের নাম লেখা হবে তার জন্মের কয়েক বছর পরে! মিথ্যে এড়িয়ে চলুন। সন্তানকে ভালোবাসুন। নিজেকে ভালোবাসুন। দেশকে ভালোবাসুন।

লেখক ★ নাসরিন সুলতানা
বরিশাল থেকে।

Share.

About Author

Leave A Reply