করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধেও আমাদের সক্রিয় হওয়া উচিত

0

করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধেও আমাদের সক্রিয় হওয়া উচিত।

প্রভাষক আমিনুর রহমান শামীম ★★ডেংগুর প্রাদুর্ভাবে গত বছর আমাদের দেশে কম প্রাণহানি হয়নি। করোনার পাশাপাশি সেটা নিয়েও কথা বলা দরকার। তাই এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বৈশ্বিক মহামারী করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বিস্তার ও প্রতিরোধে সক্রিয় হওয়া উচিত।

ন্যাশনাল গাইডলাইন – ২০১৮ অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীর লক্ষ্মণ, করনীয় ও পারিবারিক অভিজ্ঞতার আলোকে চিকিৎসা সেবার উপর লেখার চেষ্টা করছি।

আপনার ধরুন জ্বর এসেছে ১২ তারিখ। আপনি আলসেমি করে ডাক্তার দেখতে গেলেন ১৪তারিখ। অর্থাৎ জ্বরের তৃতীয় দিনে। ডাক্তার যখন দেখলেন যে আপনি জ্বরের তৃতীয় দিনে গিয়েছেন, তিনি আপনাকে Dengue NS1 antigen test করতে দিলেন, সাথে Complete Blood Count (CBC) ও করতে দিলেন। আপনি করলেন কি যে, আজকে তো টাকা নেই, ২দিন পরে করবো ! সেই টেস্ট আপনি করালেনও ২দিন পরে, অর্থাৎ ১৬ তারিখে। সেদিন হলো জ্বরের ৫ম দিন। আপনার ডেংগু টেস্ট এ রেজাল্ট আসলো ডেঙ্গু নেগেটিভ। আপনি মহান আল্লাহ্‌ পাকের দরবারে খুশিতে শুকরিয়া আদায় করতে লাগলেন। ওদিকে সিবিসিতে প্লেটলেট ৩০-৩৫হাজার/কিউমিমি, হেমাটোক্রিট ৪৫%। ডাক্তারের মাথায় হাত! আপনি তো বলবেন, টাকা খরচ করে টেস্ট করলাম, ডেংগু নেগেটিভ আসলো, ডাক্তার তাইলে ভয় দেখায় কেনো! আপনি ডাক্তারকে দিলেন দুই ঘা বসিয়ে, আর নাইলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভাংচুর করতে গেলেন, কারণ আপনার অঙ্গে অনেক কারেন্ট।

ঘটনা হচ্ছে, দোষটা আপনার। Dengue NS1 Antigen পরীক্ষা জ্বরের প্রথম ৩দিন এর মধ্যে পজেটিভ আসে(১)। এরপরে আপনার যদি ডেঙ্গু হয়েও থাকে, তাও সেটি নেগেটিভ আসতে পারে, এবং আসেও।

তাহলে কি করবেন?

১) আপনার চিকিৎসককে একদম এগজ্যাক্ট হিসেব বলবেন যে আপনার জ্বর কয়দিনের, পারলে কতো তারিখে কখন সেটাও জানাবেন। তিনিই আপনাকে জানাবেন যে আপনার কোন টেস্ট করাতে হবে।

২) ৫ম/৬ষ্ঠ দিন হতে Dengue IgG & IgM পরীক্ষা করাতে হবে(২)। যেহেতু এই পরীক্ষাটি Dengue NS1 পরীক্ষার তুলনায় কিছুটা মুল্য বেশী, তাই জ্বর আসবার সাথে সাথেই এক মুহুর্ত দেরী না করে চিকিৎসক এর পরামর্শ নিন।

৩) ডেংগু নিশ্চিত হলে, চিকিৎসক এর পরামর্শ মতো নিয়মিত CBC পরীক্ষা করাতে হবে। এ ক্ষেত্রে রিপোর্ট দেখাতে আসবার পাশাপাশি রোগীকে নিয়ে আসতে হবে। শুধু রিপোর্ট দেখে রোগীর শারীরিক অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়।

৪) আপনার চিকিৎসক যদি CBC এবং ডেংগু পরীক্ষার পরে লিভার ফাংশন টেস্ট সহ, ইসিজি, বুকের এক্সরে সহ অন্য পরীক্ষা করতে পরামর্শ দেয়, আগেই ধরে নিয়েন না যে তিনি টাকা খাওয়ার ধান্ধায় পরীক্ষা দিয়েছেন। এ ধরণের চিন্তা করবার প্রবনতা আমাদের মধ্যে রয়েছে বলেই বললাম। আবার এরূপ ধারণার যথেষ্ট কারণও রয়েছে; যা টেলিভিশনে রীতিমতো দেখছি! র‍্যাবের অভিযানে বেরিয়ে আসছে। যাক ও প্রসঙ্গে যাবো না। ডেঙ্গুতেই থাকি।

ডেংগু শক সিন্ড্রোম/ এক্সপ্যান্ডেড ডেংগু সিন্ড্রোম থেকে খুব সহজেই অরগান ফেইলার ডেভেলপ করছে। প্লেটলেট কমে রক্তক্ষরন হয়ে মৃত্যুর সেইদিন গত হয়েছে, ডেংগু এখন এসেছে নতুন রুপে। লিভার ফেইলার, কিডনি ফেইলার, একিউট রেস্পিরেটরি সিন্ড্রোম, প্লুরাল ইফিউশন সহ বিভিন্ন ধরণের নিউরোলজিকেল সিম্পটমও দেখা যাচ্ছে!

রোগী পয়সা খরচ করতে চান না বলে অনেক চিকিৎসক বাধ্য হয়ে টোটাল সিবিসি রিপিট না করিয়ে শুধু প্লেটলেট কাউন্ট রিপিট করাচ্ছেন। মনে রাখবেন, রোগীর কিছু টাকা হয়তো সেভ হচ্ছে, কিন্তু আল্টিমেটলি ১০জনের মধ্যে ১জনও যদি খারাপ হয়ে যায়, সেই দায় ডাক্তারের উপরেই আসবে। ডাক্তারকে হেমাটোক্রিট ও দেখতে হবে। এমন কি, পেশেন্ট শকে চলে গেলে তো ঘন্টায় ঘন্টায় হেমাটোক্রিট করবার নির্দেশনাও গাইডলাইনে আছে।

৫) সর্বোপরী, আমাদের ডাক্তারকে সহায়তা করতে হবে। এই মহামারিতেও পার্শ্ববর্তী যে কোন দেশের তুলনায় আমাদের দেশে ডেংগুতে মৃত্যুহার ঈর্ষনীয়ভাবে কম । এই কৃতিত্ব আমি আমাদের মিডলেভেল ডক্টর, নার্স আর ব্রাদারদের দিতে চাই।

করনীয়ঃ
১। বাথরুমে বালতি, কমোড ঢেকে রাখি।
পানির বোতলের মুখ বন্ধ রাখি।
ফুলের টবে পানি জমতে না দেই।

২। স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। ময়লা–দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দ নয়।

৩। এডিস মশা সাধারণত সূর্যোদয়ের আধা ঘণ্টার মধ্যে ও সূর্যাস্তের আধা ঘণ্টা আগে কামড়াতে পছন্দ করে। তাই এই দুই সময়ে মশার কামড় থেকে সাবধান থাকি। তবে রাত্রে উজ্জ্বল আলোতেও এডিস মশা কামড়াতে পারে। প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলন্ট স্প্রে, লোশন, ক্রিম, কয়েল ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে। যতোটা সম্ভব ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করি।

৪। বাড়ির আশপাশে ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ঘরের বাইরে মাঝেমধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হওয়ার ফলে পানি জমতে পারে—যেমন: ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, টিনের কৌটা, ডাবের পরিত্যক্ত খোসা, কন্টেইনার, মটকা, ব্যাটারির শেল, পলিথিন, চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি। এসব জায়গায় জমে থাকা পানি পরিষ্কার করি।

৫৷ প্রাকৃতিক উপায়ে মশা তাড়াতে কর্পূর ব্যবহারের বিকল্প নেই। দরজা-জানালা বন্ধ করে কর্পূর জ্বালিয়ে রুমের ভেতর রাখা যায়। ২০ মিনিট পর দেখবেন মশা একেবারেই চলে গেছে। মশার হাত থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সকালে এবং সন্ধ্যায় কর্পূর জ্বালিয়ে রাখা যেতে পারে।

৬৷ জানালার পাশে তুলসীগাছ লাগানো যেতে পারে। এই গাছে এমন কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যা মশা তাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

৭।মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকলকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানাই।

সবাই সাবধানে থাকুন। শিশুদের দিকে বিশেষ করে খেয়াল রাখুন। আর জ্বর আসলে সেটা ১দিনের জ্বর হলেও দেরী না করে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।

আসুন, নিজেরা সুস্থ্য থাকি, প্রতিবেশীদের সুস্থ্য রাখি। সবার সুস্থ্যতা কামনা করছি।

তথ্যসুত্রঃ National Guideline for Dengue 2018,পৃষ্ঠাঃ ১৫ ও ২০

Share.

About Author

Leave A Reply