একজন নীরব দক্ষ সংগঠক হিসেবে যিনি ধূপের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।

0

একজন নীরব দক্ষ সংগঠক হিসেবে যিনি ধূপের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।

-প্রভাষক আমিনুর রহমান শামীম ( বিশেষ প্রতিনিধি) ♦♦ মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সৃষ্টি হয়, মানুষই সৃষ্টি করে ইতিহাস, সেই ইতিহাসের সামনে কখনও কখনও কিংবদন্তিতুল্য নেতা ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বাঙালীর শত বছরের মুক্তি সংগ্রামে হিমালয়তুল্য যে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তিনি হচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, ইতিহাসের এক মহানায়ক, যাঁর জীবনাবসান হয় সপরিবারে স্বাধীনতার পরাজিত ঘাতকদের বুক বিদীর্ণ করা বুলেটের আঘাতে।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার মধুমতির নদীর তীরে অজপাড়াগাঁয়ে বেড়ে ওঠা দুরন্ত কিশোর শেখ মুজিব আমৃত্যু
সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে
প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন কালজয়ী
নেতার আসনে। যতদিন বাঙালী থাকবে, বাংলাদেশ থাকবে ততদিন থাকবেন শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ মুজিবের শৈশব-কৈশোর তথা সমগ্রজীবন পর্যালোচনা করলে একজন মহানায়কের আবির্ভাবের পেছনে ছায়া ও কায়ার মতো একজন মহীয়সী নারীর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সেই মহীয়সী নারী আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু পত্নী
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার গর্ভধারিণী মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বেগম মুজিবের যখন বিয়ে হয় তখন বেগম ফজিলাতুন্নেছার বয়স ৩ আর শেখ মুজিবের বয়স ছিল ১০ বছর।

পৃথিবী তখনও বর্তমান সভ্যতার
আলোকিত পর্বে উদ্ভাসিত হয়নি, তবুও শৈশব থেকে এই সংগ্রামী মানুষটিকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যিনি আগলে
রেখেছিলেন তিনি হচ্ছেন বেগম
মুজিব। যাঁর ছিল না কোন লোভ, মোহ। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বাঙালীর প্রতিটি সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু নিজেকে আপোসহীনভাবে সম্পৃক্ত করেছেন, নিজেকে নিয়ে এসেছেন নেতৃত্বের কাতারে। ঠিক তারই পেছনে দৃঢ়তার সঙ্গে অবস্থান নিয়েছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

আগামী ৮ আগস্ট বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন। বেগম মুজিবের জন্মদিন পালিত হওয়া উচিত অনাড়ম্বর পরিবেশে।

বাঙালীর মুক্তির সংগ্রামের পাতায় পাতায় তাঁর যে অনস্বীকার্য অবদান তা হয়ত নতুন প্রজন্ম এবং ব্যাপক
জনগোষ্ঠী সেভাবে অবগত নয়। বেগম মুজিব একদিকে যেমন সামলিয়েছেন কারাবন্দী স্বামীর রেখে যাওয়া সংসার, অন্যদিকে কারাবন্দী মুজিব সংগ্রামের কঠিন দিনগুলোতে নেতা ও কর্মী বাহিনীর প্রতি যে নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন তা সময় মতো এবং যথাযথভাবে বাস্তবায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টি নজরদারি করেছেন।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালীর জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সংগ্রামের যে নবধারা সূচিত হয় সেই থেকে শুরু করে ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অবধি বেগম মুজিব এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন।সেই ঘটনাবলীর দিকে কিছুটা আলোকপাত করছি।

বাঙালী জাতির একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন তা বাস্তবায়নের মূল বাহন ছিল বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে যে নিউক্লিয়াস ঘটিত হয়েছিল সেটার যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনক্রমে সংগঠন, আন্দোলন এবং সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে
ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই ছাত্র ও তরুণ সমাজের প্রধান এবং সর্বাত্মক প্রেরণার উৎসস্থল ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে, নেতৃত্বের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে যখনই কোন সঙ্কটের কালোছায়া পড়েছে বেগম মুজিব তা দূর করার জন্য পর্দার অন্তরালে দৃঢ় এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। এ আমাদের নতুন প্রজন্মের কথা নয়, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যারা ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তাদের ঘরোয়া আলাপচারিতায় এই সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠ কথাগুলো বার বার উঠে আসে। কিন্তু ইতিহাস তা লিপিবদ্ধ করেনি।

উত্তরাধিকার সূত্রে বেগম মুজিব যতটুকু অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছিলেন তার পুরোটাই তিনি ব্যয় করেছেন নিঃশর্তভাবে সংসার এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত রাজনীতির পেছনে।
তিনি একদিকে কিছু টাকা জমিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য যে প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ দেয়া হতো সেখান থেকে ঋণ নিয়ে পরিবারের জন্য বঙ্গবন্ধু ভবনখ্যাত ৩২ নম্বরের বাড়িটির কাজ সুসম্পন্ন করেন।

পুত্রসমশহীদ শেখ ফজলুল হক মণি, নিজ পুত্র শহীদ শেখ কামাল, কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, শেখ জামাল এবং কনিষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ রাসেলের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার সমস্ত দায়িত্ব সূচারুভাবে পালন করেছেন।

আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে ছাত্রলীগ এবং।আওয়ামী লীগের পেছনে যতটুকু আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল তাও তিনি করেছেন। ছাত্র এবং তরুণদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিয়ে কখনও কখনও বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। সেই বিভেদও তিনি একজন দক্ষ সংগঠক ও নেতা যেমনভাবে সমাধান করেন ঠিক তেমনিভাবে সমাধান করেছিলেন।

খণ্ড -১

Share.

About Author

Leave A Reply